শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১০ অপরাহ্ন
যোগদানের মাত্র সাত দিনের মাথায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলিতে অনিয়ম ও ‘বদলি বাণিজ্যের’ গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে শূন্যপদ না থাকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, আবেদন না করা শিক্ষককে বদলি এবং শূন্যপদে আবেদন করেও শিক্ষককে বঞ্চিত করার মতো একাধিক ঘটনা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বদলির ক্ষেত্রে নিয়মনীতি ও জ্যেষ্ঠতার তোয়াক্কা না করে পছন্দের শিক্ষকদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কোথাও জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে কনিষ্ঠ শিক্ষক বদলি পেয়েছেন, কোথাও আবার শূন্যপদ না থাকা বিদ্যালয়েও দেওয়া হয়েছে পদায়ন। এসব ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন মো. আবু বকর সিদ্দীক। এর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হয় শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়া। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেন। আবেদনের শেষ সময় ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর। এর পরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর বদলি কমিটির সভা ও রেজুলেশনের মাধ্যমে একাধিক শিক্ষককে বদলির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
তবে তালিকা প্রকাশের পরই বদলি প্রক্রিয়ায় একের পর এক অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে আসে।
সদর উপজেলার পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও চৈতার খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুর রহিমকে ওই বিদ্যালয়ে বদলি করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শূন্যপদের তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম না থাকার পরও সেখানে শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁকে সেখানে বদলি করা হলো?
শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই বদলি হয়েছে। এ ঘটনায় বদলি কমিটির সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. ফরিদা বেগমকে ১১ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে পৌর এলাকার ভেলাকোপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই বদলি আদেশে আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতার ক্রম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের দাবি, জ্যেষ্ঠতার নির্ধারিত ক্রম যদি অনুসরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে ফরিদা বেগম কীভাবে ১১ জনকে পেছনে ফেলে বদলির সুযোগ পেলেন-এ প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ফরিদা বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনি আমাকে এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন না। এ প্রশ্ন শিক্ষা অফিসারকে করেন।”
এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অভিযোগ রয়েছে, সদর উপজেলার আরও ছয়টি বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা উপেক্ষা করে ৯জন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দোবারিয়ার ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকার, চাকেন্দা খানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রোকসানা পারভীন, রেলবাজার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পাপড়ি রানী এবং পরমালী বড়ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুনিরা আক্তার।
শিক্ষকদের অভিযোগ, জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুসরণ করা হলে এসব বদলি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে তালিকার সঙ্গে চূড়ান্ত বদলি আদেশের অসামঞ্জস্য দেখা যাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পরমালী বড়ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুনিরা আক্তারের বদলি নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়করণ করা হলেও তাঁর চাকরিকাল ২০১০ সালের ৫ আগস্ট থেকে গণনা দেখিয়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতেই তিনি বদলির সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয় জাতীয়করণের তারিখের সঙ্গে চাকরিকাল গণনার এই পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো, কোন নথির ভিত্তিতে তা গ্রহণ করা হলো এবং বদলি কমিটি কীভাবে বিষয়টি যাচাই করেছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
সারডোব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদা আক্তারকে বালাকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওই বদলির জন্য আবেদনই করেননি।
শিক্ষকদের প্রশ্ন, যেখানে ২০টি শূন্যপদের বিপরীতে ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেছেন, সেখানে আবেদন না করা একজন শিক্ষক কীভাবে চূড়ান্ত বদলি তালিকায় স্থান পেলেন?
এ ঘটনায় বদলি আবেদনপত্র ও চূড়ান্ত আদেশের তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, পূর্ব লক্ষীকান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুখাইরুল ইসলাম বাণীর খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন করেও বদলি পাননি বলে অভিযোগ।
অর্থাৎ একই প্রক্রিয়ায় একদিকে আবেদন না করেও শিক্ষক বদলি হয়েছেন। অন্যদিকে শূন্যপদে আবেদন করেও একজন শিক্ষক বদলির সুযোগ পাননি। এই বৈপরীত্যই বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ছয়জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে বদলি
রেলবাজার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পাপড়ি রানীকে যতীনেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছয়জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুযায়ী অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা যাঁদের, তাঁদের বাদ দিয়ে পাপড়ি রানী কীভাবে বদলির সুযোগ পেলেন-এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
বদলি বাণিজ্যে কুড়িগ্রাম জেলা সদস্য সচিব ইমারুল হক টুটুলের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক সংগঠন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকদের পক্ষে তদবির করেন এবং বদলি সংক্রান্ত বিভিন্ন যোগাযোগে সক্রিয় থাকেন। শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের পরিবর্তে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বদলি সংক্রান্ত তদবিরে ব্যস্ত থাকেন।
তাঁর এই ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক মহলেও প্রশ্ন উঠেছে-একজন কর্মরত শিক্ষক কীভাবে উপজেলা পর্যায়ের বদলি প্রক্রিয়ায় এতটা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন?
পূর্বের কর্মস্থল দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ হয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় যোগ দেন মো. আবু বকর সিদ্দীক। যোগদানের সাত দিন না পেরোতেই একসঙ্গে একাধিক শিক্ষক বদলির ঘটনায় তাঁর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পরপরই বদলি প্রক্রিয়াকে ঘিরে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার কয়েকটিতে শূন্যপদ, আবেদন ও জ্যেষ্ঠতার তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দীক বলেন, “উৎকোচ নিয়ে বদলিদানের বিষয়টি সঠিক নয়। বদলি করার ইখতিয়ার আমাররহাতে নেই৷ বদলি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। ভুল ইনফরমেশনের কারণে একটু মিসটেক হতে পারে।”
তবে তাঁর বক্তব্যে বদলি প্রক্রিয়ায় ‘ভুল ইনফরমেশন’-এর বিষয়টি উঠে এসেছে। কোন তথ্য ভুল ছিল, সেই ভুল কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো বদলি আদেশ হয়ে থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না-এসব প্রশ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বদলি কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির উত্থাপিত যে আবেদনগুলো আমরা পেয়েছি, সেই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে বদলি করা হয়েছে। তবে যদি কেউ মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বদলিতে ভূমিকা পালন করে থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।”